আমাদের ওয়েবসাইট Getartimages স্বাগতম। আজ আমরা ছবি আঁকার প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে কিছু কথা বলতে যাচ্ছি। আপনারা অনেকেই ছবি আঁকার প্রাথমিক ধারণা, রঙের ব্যবহার, তুলির ব্যবহার সম্পর্কে খোঁজেন কিন্তু কোথাও সঠিক তথ্য পান না। তাই আজ এই পোস্ট টিতে ছবি আঁকার প্রাথমিক ধারণা, রঙের ব্যবহার, তুলির ব্যবহার এবং আরো অন্যান বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেছি।
ছবি আঁকার প্রাথমিক ধারণা
ছবি আঁকতে গেলে তার প্রাথমিক ধারণা থাকা অবশ্যই জরুরী। প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকলে ছবি আঁকা যায় না। যেমন ছবিতে পরিপ্রেক্ষিতের (perspective) ধারণা ছাড়া বস্তুর কাছে দুরে বোঝানো যায় না। ছবিতে ঘনত্ব বোঝাতে পরিপ্রেক্ষিত (perspective) প্রয়োজন। ছবির বিন্যাস (composition) এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছবি আঁকতে নিম্নলিখিত চারটি ধারণা থাকা অবশ্যই প্রয়োজনীয়।
- (ক) অনুপাত (Scale and Proportion)
- (খ) পরিপ্রেক্ষিত (Perspective)
- (গ) আলো-ছায়া (Light and Shade )
- (ঘ) বিন্যাস (Composition)
(ক) অনুপাত (Scale and Proportion):
ছবিতে এক বস্তুর সঙ্গে অন্যবস্তুর অনুপাতের সম্পর্কে জানা অবশ্যই দরকার। যেমন একটা বোতলের সঙ্গে গ্লাসের অনুপাতের সম্পর্ক। বোতলের পরিমাপ হওয়া উচিত মোটামুটি দুটি গ্লাসের সমান। অনুপাত ছাড়া ভালো ছবি আঁকা যায় না। একটা কুকুরের যে পরিমাপ হবে, একটা বেড়ালের পরিমাপ তার থেকে কম হবে। আবার একটা ইঁদুর তার থেকে আরও ছোট হবে। । এইভাবে অনুপাত ছবিতে প্রয়োজন হয়।
(খ) পরিপ্রেক্ষিত (Perspective):
ছবিতে পরিপ্রেক্ষিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও অনেকে অনুপাতের সঙ্গে পরিপ্রেক্ষিত এক করে ফেলে। এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। পরিপ্রেক্ষিত বলতে সামনের বস্তু বড় এবং দূরের বস্তু ছোট। একটা বস্তুকে সামনে যত বড় দেখাবে, যত দূরে যাবে ভত ছোট হতে থাকবে। বিশেষকরে ছবিতে ঘনত্ব আনতে পরিপ্রেক্ষিত ব্যবহার করতে হবে। নিচের ছবিতে কয়েকটা বাড়িকে সামনে থেকে দূরে দেখানো হল।
পরিপ্রেক্ষিতের ক্ষেত্রে দিগন্তরেখা (Horizontal line), বিলীয়মান বিন্দু (Vanishing point), eye-level এসবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন নিচে একটা বাক্সকে বিভিন্ন দিক থেকে দেখানো হল।
একটা বস্তুকে বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন রকম দেখায়। বস্তুটিকে উপর থেকে দেখলে যে রকম দেখাবে, নীচ থেকে আরেক রকম। দেখার জায়গা পাল্টে গেলে বক্সের দৃশ্য পরিবর্তিত হয়ে যায়।
(গ) আলো-ছায়া (Light and Shade)
আলো-ছায়া (Light and Shade) ছবি আঁকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা যখন কোন বস্তু দেখি তার মধ্যে আলো-ছায়া অবশ্যই থাকবে। আলোর উৎস যদি সূর্য হয়। তাহলে সূর্য যেদিকে থাকবে সেই অংশে আলো থাকবে। উল্টোদিকের অংশে ছায়া থাকবে। ড্রইংয়ের পাশাপাশি আলোছায়ার মাধ্যমে ছবির ঘনত্ব পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। আলো-ছায়ার মাধ্যমেই দৃশ্যগত বিভ্রম তৈরি করা হয়। নিচে আলোছায়াযুক্ত একটি বস্তুর ছবি নেওয়া হল।
(ঘ) বিন্যাস (Composition ):
ছবির ক্ষেত্রে বিন্যাস (Composition) -এর গুরুত্ব অপরিসীম। যে কোনো ভালো ছবি আঁকতে গেলে ছবিটার ঠিকভাবে সাজানো দরকার। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় মনে রাখতে হবে। (১) ভারসাম্য (Balance) (২) কেন্দ্রবিন্দু (focus) (৩) সমন্বয় (Unity)
উপরোক্ত, তিনটি বিষয় ছবির বিন্যাস বা Composition-এর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়।
- ভারসাম্য (Balance): ছবির মধ্যে form বা আকার, রঙ, বিষয়ের ভারসাম্য (Balance) থাকা জরুরি। ছবিতে ভারসাম্য ছাড়া ছবির বাধন অসম্পূর্ণ থাকে। নীচের চিত্রটিতে ভারসাম্য (Balance) দেখানো হয়েছে।
- কেন্দ্রবিন্দু (focus) : প্রত্যেক ছবিতে নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দু থাকে। যখন কোনো ছবি দেখি তাতে নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দুতে চোখ আটকে যায়। একে ঘিরে সমস্ত ছবি আবর্তিত হয়।
- সমন্বয় (unity) : ছবিতে ভারসাম্য, কেন্দ্রবিন্দুর পাশাপাশি সম্যা বা (unity) খুবই প্রয়োজনীয়। একটা রঙ, আকার, বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় (unity) অবশ্যই থাকবে।
বিভিন্ন বস্তুর ত্রিমাত্রিক আকার
উপকরণ : আর্টপেপার, পেন্সিল, রবার, ড্রইংবোর্ড, ক্লীপ, রঙ (প্যাস্টেল, বিভিন্ন শেডের পেন্সিল, পোষ্টার রঙ)
পদ্ধতি : একটা আর্টপেপারের ১/৪ ভাগ অংশ নিয়ে তার উপর যে কোনো একটি বস্তুর ত্রিমাত্রিক ড্রইং করতে হবে। সেই বস্তুকে আলোছায়া ধরে পেন্সিল শেড বা রঙ ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক রূপ প্রকাশ করা। ছবির মধ্যে Light and shade, Perspective ইত্যাদি ব্যবহার করে বস্তুর ত্রিমাত্রিক রূপ পরিস্ফুট করতে হবে। যেমন কোন ফল আঁকলে তার রঙ, আলোছায়া ধরে আঁকতে হবে। প্রয়োজনে বস্তু সামনে বসিয়ে দিয়ে তা দেখে ছবি আঁকতে হবে। যাকে ছবির ভাষায় Still life বলা হয়। এতে রঙ, আলোছায়া, বিন্যাস ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হবে।
উদ্দেশ্য:
- বিভিন্ন বস্তু অর্থাৎ ফল, ফুল, জ্যামিতিক আকার, ফুলদানি, গ্লাস, পাখি, মাছ, মানুষ ইত্যাদি সম্পর্কে আঁকার ধারণা।
- আলোছায় ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক ধারণা।
কম্পোজিশন (Composition)
উদ্দেশ্য :
- প্রাকৃতিক দৃশ্যকে আঁকার মাধ্যমে রপ্ত করা।
- ছবির সামনে, পেছনে বিভিন্ন গভীরতা সম্পর্কে ধারণা।
ছবির বিন্যাস (Composition) সম্পর্কে ধারণা লাভ করা।
উপকরণ : আর্টপেপার, তুলি, রঙ প্যালেট, জলের পাত্র, বোর্ড, পেন্সিল, রবার, ক্লীপ ইত্যাদি।
পদ্ধতি : একটি ১/৪ ভাগ আর্টপেপারে পেন্সিল দিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য বা নদী নিয়ে দৃশ্য বা পাহাড়ের দৃশ্য এঁকে নিতে হবে। তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী রঙ ব্যবহার করতে হবে। প্যাস্টেল বা জল রঙ যে কোনো রঙ ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার অস্বচ্ছ রঙ ব্যবহার করে ছবিগুলি রঙ করা যেতে পারে।
রঙের প্রয়োগ
উপরোক্ত ছবি আঁকার ক্ষেত্রে রঙ ব্যবহার করলে রঙ সম্পর্কে জানা দরকার। রঙ দুই প্রকারের হয়।
- (১) প্রাথমিক বা মৌলিক রঙ
- (২) মিশ্র বা যৌগিক রঙ
- প্রাথমিক রঙ: যে রঙ অন্য কোনো রঙের দ্বারা প্রভাবিত নয় এবং নিজস্বতা আছে, তাকে প্রাথমিক রঙ বলে। প্রাথমিক রঙ তিনটি – লাল, নীল, হলুদ।
- মিশ্র রঙ : দুই বা ততোধিক রঙের মিশ্রণে যেসব রঙ উৎপন্ন হয় তাকে যৌগিক বা মিশ্র রঙ বলে। যেমন- কমলা, সবুজ, বেগুনী ইত্যাদি।
বর্ণচক্রে তিনটি প্রাথমিক রঙের সংমিশ্রণে মিশ্র রঙগুলি তৈরি হয়েছে।
যেমন-
- লাল + নীল = বেগুনী
- নীল + হলুদ = সবুজ
- লাল + হলুদ = কমলা
এছাড়া কিছু মিশ্র রঙ নিচে দেওয়া হল—
- নীল + সাদা = আকাশি
- লাল +সাদা গোলাপি
- লাল + কালো = খয়েরি
- কালো + সাদা = ধূসর
- নীল + কালো = কালচে নীল
- নীল সবুজ = গাঢ় সবুজ
- লাল + খয়েরি = বাদামি
এইভাবে রঙগুলির সঙ্গে সাদা মেশালে হাল্কা এবং কালো মেশালে গাড় রঙ পাওয়া যায়।
পরিপূরক রঙ বা বিপরীত রঙ
বর্ণচরে দুটি প্রাথমিক রঙের সংমিশ্রণে একটি মিশ্র রঙ উৎপন্ন হচ্ছে। ঐ দুটি প্রাথমিক রঙ বাদে তৃতীয় প্রাথমিক রঙটি উৎপন্ন রঙের পরিপূরক বা বিপরীত রঙ। যেমন—
- লাল - সবুজ (নীল + হলুদ)
- হলুদ - বেগুনী (লাল +নীল )
- নীল - কমলা (লাল + হলুদ)
উষ্ণ রঙ (Warm colour)
যে রঙগুলি উজ্জ্বল এবং চোখের পীড়াদায়ক সেগুলিকে উষ্ণ রঙ বলা হয়।
যেমন লাল, হলুদ, কমলা ইত্যাদি রঙ।
শীতল রঙ (Cool colour)
যে রঙগুলি অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল এবং চোখের পক্ষে আরামদায়ক সেগুলি শীতল রঙ বলা হয়।
যেমন— নীল, সবুজ ইত্যাদি রঙ।
বিভিন্ন রঙের নাম
ছবি আঁকতে হলে বর্তমান বাজারে যে সব রঙ পাওয়া যায়, তার সঠিক নাম জানলে সঠিক রঙ পাওয়া যাবে। এইসব রঙের নাম বেশিরভাগ রঙের উৎস অনুযায়ী হয়েছে অর্থাৎ পাথর, ধাতু যেখান থেকে পাওয়া গেছে। বিভিন্ন রঙের নাম নীচে দেওয়া হল:
- লাল : ভারমিলিয়ন, স্কারলেট, ক্রিমসন, রোজ ম্যাটার, কারমাইন।
- নীল : ইন্ডিগো, কোবাল্ট ব্লু, আল্ট্রামেরিন ব্লু, প্রুশিয়ান ব্লু, সেলুলীয়ন ব্লু।
- হলুদ: লেমন ইয়েলো, ক্লোম ইয়েলো, ক্যাডমিয়াম ইয়েলো, ইয়েলো অকার, গ্যামবোজ, নেপেলস্ ইয়েলো।
- সবুজ : ভিরিডিয়ান গ্রীন, স্যাপ গ্রীন, হুকারস্ গ্রীন, ক্লোম গ্রীন, টেরাভার্ট।
- খয়েরি: বার্ন আম্বার, র আম্বার, বার্ন সিয়েনা, র সিয়েনা, সিপিয়া, ইন্ডিয়ান রেড, লাইট রেড।
- রঙের গুঁড়ো (pigment) সংগ্রহ করে আঠা মিশিয়ে রঙ তৈরি করে নেওয়া যায়।
তুলির ব্যবহার
- তুলি বিভিন্ন রকমের পাওয়া যায়। তেল রঙের ছবি আঁকার জন্য Hog hair আবার জলরঙ করার জন্য Sabale hair । আমরা এখানে Sabale hair-এর তুলিই ব্যবহার করব। Sabale hair-এর মধ্যে দু রকম তুলি পাওয়া যায়
- (1) Round hair
- (2) Flat hair
- Round hair-এর ক্ষেত্রে সরু লাইন টানার জন্য ডাবল বা ট্রিপল জিরো লাগবে এবং উপরের দিকে উঠব তত মোটা হবে যেমন ০,১,২,৩,৪,৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ ইত্যাদি।
- Flat hair-এর ক্ষেত্রে দু'রকম তুলি পাওয়া যায় - (১) লম্বা হাতল (২) ছোট হাতল। লম্বা হাতল Flat hair-এর ক্ষেত্রে ১ থেকে ১৮ বা ২০ অবধি তুলি পাওয়া যায়। ছোট হাতল Flat hair এর ক্ষেত্রে তুলি ১/৪ ইঞ্জি থেকে ৩ ইনি অবধি পাওয়া যায়
উপসংহার: ছবি আঁকার প্রাথমিক ধারণা
আজ আমরা ছবি আঁকার প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে কিছু কথা বলেছি। আপনারা অনেকেই ছবি আঁকার প্রাথমিক ধারণা, রঙের ব্যবহার, তুলির ব্যবহার সম্পর্কে খোঁজেন কিন্তু কোথাও সঠিক তথ্য পান না। তাই আজ এই পোস্ট টিতে ছবি আঁকার প্রাথমিক ধারণা, রঙের ব্যবহার, তুলির ব্যবহার এবং আরো অন্যান বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেছি।





0 Comments